গভীর সমুদ্রে | Bangla Golpo

গভীর সমুদ্রে | Bangla Golpo

গভীর সমুদ্রে – Bangla Golpo
প্রথম পর্ব

১।
সারারাত বাস জার্নি, তারপর অনেকক্ষণ অপেক্ষা, তারপর স্টিমারে ২-৩ ঘণ্টা কাটানোর পর যখন সেইন্ট মারটিন্সে আসলাম টুরের শখ অনেকখানি মিটে গেছে। জাহাজ যখন জেটিতে নামল তখন মেজাজ আরও খারাপ হোল। মারাত্মক গরম, এক চিলতে ছোট্ট একটা সমুদ্র, মায়ানমার দেখাই যায়, তার উপর কুলি আর মাঝি মাল্লারা চিল্লাচিল্লি করে সদরঘাটের পরিবেশ তৈরি করেছে। বিরক্ত হয়ে হোটেলে গিয়ে সোজা ঘুম দিলাম।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা সন্ধ্যা হোল, আমার ঘুমও ভাঙল। একটা রিক্সা নিয়ে পেছনের বিচটাতে গেলাম। ততক্ষণে সৌন্দর্যের মেলা বসেছে প্রবাল দ্বিপটাতে: বিরাট বিরাট প্রবালের ব্রিজে উপচে পড়ছে ঢেউ, আকাশ ছেয়ে গেছে বর্ষার মেঘে আর সেই মেঘের ফাঁকে উঁকি মারছে ডুবন্ত সূর্য। হু হু করে বাতাস হচ্ছে, প্রবালের ব্রিজে বাতাসে হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে ক্লাস মেট কপোত কপোতীরা।

সেইন্ট মারটিন্সে জীবনের প্রথম রাত আমার কাছে স্বপ্নের মতো। সেই সময় রাতে বিচের উপর হাঁটলে পায়ের ছাপের উপর পরে থাকতো আলোর ট্রেইল। চালের সাইজের গোল গোল একেকটা কণা বালুর উপর ঝিকমিক করে জ্বলত। সেই আলোর ট্রেইল পিছনে রেখে, ২জন ক্লাসমেট সহ আমরা হেঁটে গেলাম পেছনের বিচ থেকে সামনের বিচে। ততক্ষণে মেঘ কেটে গেছে, হু হু করে বাতাস হচ্ছে, আর রাতের আকাশে ঝলমল করছে কোটি কোটি তারা। আর কিছুক্ষণ পরপর দূরে সাগরের বুকে আছড়ে পড়ছে রকেটের মতো উল্কা।

রাত ১১টার দিকে একেবারে কমলার কোয়ার মতো কমলা রঙের একটা চাঁদ উঠল। তার আবছা আলোয় ধোঁয়াটে হয়ে উঠল রাতের সাগর। দূরে, বহুদূরে পালতোলা ভাঙ্গা জাহাজের মতো কি জানি একটা নড়ে উঠল। সেই কমলার মতো চাঁদ, আলোর ধোঁয়াশা, ভূতুরে ভাঙ্গা জাহাজ আর বাতাসে উথাল পাথাল ঢেউ আমাকে নিয়ে গেলো অন্য এক রাতে।
যে রাতে স্ট্রোন্সে বিস্টের ৫৫ ফুট লম্বা পচা গলা লাশ স্কটল্যান্ডের কোন এক দ্বীপের সমুদ্র তীরে ভেসে উঠেছিল, সেই রাতে।
যে রাতে, কোন এক অজানা কারনে মেরি কেলেস্টের ১০ জন যাত্রী ভূতুরে জাহাজটা ছেড়ে চিরদিনের মতো হারিয়ে যায়, সেই রাতে।
যে রাতে জে. ডি. স্টারকি ৫৩ মিটার লম্বা ক্র্যাকেন সাইজের স্কুইড দেখার দাবি তুলেছিলেন সেই রাতে।

চলুন ডুব দিয়ে আসি ওই কালো পানির আশ্চর্য রহস্যময় জগত থেকে।

bangla golpo

২।
দূর সাগরের বুক থেকে মাঝে মাঝে তীরে ভেসে আসে অজানা প্রাণীর পচা গলা লাশ। মাঝে মাঝে এদের অবস্থা এমন খারাপ হয় যে চোখ নাক মুখ কিছুই বোঝা যায় না, বোন স্ট্রাকচারো ঠিক বোঝা যায় না। এই অবস্থায় এদেরকে বলে গ্লবস্টার।

১৮০৮ সালে স্কটল্যান্ডের স্ট্রোন্সে দ্বীপে আঘাত হানল এক মারাত্মক ঝড়। সেই ঝড়ে ভেসে আসলো স্টোনসে বিস্টের গ্লবস্টার। ৫৫ ফুট লম্বা এই লাশটার প্রস্থ ছিল মাত্র ৪ ফুট। তার ছিল ৩ জোড়া পাখনা বা পা। সাড়া শরীরে তার ছোট ছোট কাঁটার মতো ছিল। এই কাঁটার মতো জিনিষগুলো অন্ধকারে ভেজা অবস্থায় জ্বলজ্বল করতো।

লক নেস মনস্টারের মতো আকৃতির এই অদ্ভুত লাশটা অনেক বিতর্কের জন্ম দেয়। ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির বিজ্ঞানীরা একে সনাক্ত করেন অজানা কোন নতুন প্রজাতি হিসাবে। অ্যানাটমিস্ট এভারারড হোম এবং জন গুডস্যার তাকে সনাক্ত করেন অস্বাভাবিক লম্বা কোন বাস্কিং শার্কের লাশ হিসাবে। প্রচুর কারটিলেজের উপস্থিতি এবং শক্ত হাড্ডির অনুপস্থিতি আসলেই কোন জাতের হাঙ্গরের দিকে ইঙ্গিত করে।

এই লাশটা প্রিজারভড নেই। বর্তমানে আধুনিক ল্যাবরেটরিতে নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই সে আসলে কি ছিল। ৫৫ ফুট লম্বা বাস্কিং শার্ক কোনোদিন দেখা যায় নি। ভাবতে ভালো লাগে, প্রবল ঝড়ের রাতে, মানুষের অজানা কোন প্রাগৈতিহাসিক সাগর দানো হয়তো তার নিরাপদ আধার থেকে বেরিয়ে এসেছিল, ঝড়ে ভাসতে ভাসতে চলে এসেছিল মানুষের দুনিয়ায়।

(চলবে)…

Leave a Comment