‘হানিফ, কালুকে দেখলে বুঝা যায় যে গরীবেরও ভালো মন আছে “এক মানবিক বাংলাদেশ”

আখাউড়া: ঘড়ির কাঁটায় রাত নয়টা। স্বাভাবিক কারণেই স্টেশনে সুনসান নীরবতা। তবে আলোর কমতি নেই। স্টেশনের এক নম্বর প্লাটফরমে অর্ধনগ্ন এক নারী ভাত খাওয়া দেখে কিছুটা ‘বিচলিত’ সঙ্গে থাকা বন্ধু পলাশ ও জীবন। অবশ্য আমার জন্য এটা চিরচেনা দৃশ্য! ‘লিলি পাগলী’ নামে পরিচিত ওই নারীকে প্রায়ই খেতে দেখি স্টেশনের এখানে সেখানে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশন হতে ট্রেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেতে প্রায়ই ওই নারীকে দেখি।

তবে বন্ধুদের একটা কথায় আমিও কিছুটা ‘বিচলিত’ হই। ওরা বলছিলো, এই সময়ে ওই নারী খাবার পেল কোথায়? অনুসন্ধিৎসু মন বলছিলো বিষয়টা জানতে হবে মিনিট কয়েকের মধ্যে মাঝ বয়সি এক ব্যক্তি ওই নারীকে বলছিলেন কাছে একটা জায়গা হাত-মুখ ধুয়ে পলিথিনটা যেন নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলেন।

মাঝ বয়সি ব্যক্তির নাম মো. কালু মিয়া। জানতে চাইলে পরিচয় দিলেন, ‘আমি মিস্টার কালু। বাংলায় মোহাম্মদ কালু। সবাই আমাকে কালু মিয়া হিসেবেই চেনে। আমি প্রাইমারি নট পাশ হলেও কিছু কিছু ইংরেজি বলতে পারি।’ কথায় কথায় কালু মিয়া বারবারই ইংরেজিতে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন।  কালু মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে এলো এক ‘মানবিক বাংলাদেশের’ কথা। ওই অর্ধনগ্ন নারীকে তিনিই ভাত খেতে দিয়েছেন। রিকশা চালক হানিফ মিয়া তাঁকে যে খাবারটুকু দিয়েছিলেন সেখান থেকেই বেশ অর্ধেকটা ওই পাগলীকে দিয়েছেন। সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় ওই নারী খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন বলেই কালু মিয়ার এ মানবিকতা।

নুন আনতে পান্তা ফুরায় হানিফ মিয়ার। অথচ ওই ব্যক্তিই কিনা করোনা পরিস্থিতিতে গত চার-পাঁচদিন ধরে মানবসেবা করে যাচ্ছেন। অর্ধহারে অনাহারে থাকা কর্মহীন ও আয় না থাকা ১৫ জনকে তিনি নিজে রান্না করে খাওয়াচ্ছেন। শুক্রবার তিনি নিজে বাড়িতে আলু ভর্তা আর ডাল-ভাত খেলেও অসহায়দের খাইয়েছেন মুরগির মাংস, পুঁইশাক ও ডাল। এ যেন মানবিকতার এমন বাস্তব ‘গল্প। যে গল্প থেকে শেখার কিংবার জানার আছে অনেক কিছু। হানিফদের এ কর্মকাণ্ড মোবাইল ফোন কিংবা ক্যামেরার ফ্রেমে বাঁধা পড়ে না।

কালু মিয়ার সঙ্গে ছুটে চলি হানিফের বাড়ির উদ্দেশ্যে। স্টেশন থেকে আধাকিলোমিটারের বেশি পথ হেঁটে যেতে হয় রেললাইন ধরে। হানিফ মিয়ার বাড়ির সামনে ঘুটঘুটে অন্ধকারের এক ভুতুড়ে পরিবেশ। সঙ্গে যোগ হয় বন্ধু আশীষ সাহা। স্থানীয় এক ব্যক্তির সহায়তায় যাই হানিফের বাড়িতে।
আখাউড়া পৌর এলাকার দেবগ্রামের তালপট্টিতে খোরশেদ মিয়ার বাড়ির একটি ঘরে ৮০০ টাকা ভাড়ায় থাকেন হানিফ মিয়া। প্রায় ১৫ বছর ধরে থাকেন আখাউড়ায়। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার পাশেই।

সংসারে মা, স্ত্রী, তিন সন্তানসহ মোট ছয়জন। এক সন্তান চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। বাকিরা ছোট। রিকশাচালক হানিফের প্রতিদিনের আয় ছয় থেকে সাতশ’ টাকা। সেই টাকা দিয়ে নিজের সংসার খরচ জোগানোই হিমশিম হয়। এখন আবার তিনি স্টেশনে থাকা ছিন্নমূল অসহায়দের খাওয়ানোর মত মহৎ কাজ করে যাচ্ছেন। হানিফ মিয়া বলেন, ‘রিকশা নিয়ে তো প্রায়ই স্টেশনে যাই। আমি দেখি যে স্টেশনে থাকা মানুষরা যে কি ধরনের অসহায়। সেই চিন্তা থেকেই আমি একদিন পরপর অন্তত ১৫ জনকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছি।

আল-আমিন নামে একজনের দেয়া চারশ’ টাকা ও নিজের পকেট থেকে আর তিনশ’ টাকা দিয়ে শনিবার রাতে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করি।’ মা রুবি আক্তার ছেলের কর্মকাণ্ডে বেশ খুশি। স্ত্রী ইয়াছমিনও আপত্তি তুলেন না। কথা হলে তাঁরা বলেন, ‘এটা তো ভালো কাজ। যেহেতু তাঁর মন চাইছে সে করতে থাকুক। আমরা এতে কষ্ট করলেও মনে কোনো কষ্ট থাকবে না।’ খোরশেদ মিয়ার বাড়ির কেয়ারটেকার নুরুন্নাহার বেগম বলেন, ‘হানিফ খুবই ভালো ছেলে। কয়দিন ধরে সে নিজেই রান্না করে অসহায়দের খাওয়াচ্ছে। হানিফের এমন কাজ দেখে মন চায় সাহায্য করি। তবে সামর্থ নাই বলে পারছি না।’

প্রতিবেশি কৃষক মো. এখলাছ মিয়া বলেন, ‘হানিফকে দেখলে বুঝা যায় যে গরীবেরও ভালো মন আছে। তাঁর এ কাজে আমরা সবাই খুশি। হানিফের মতো যদি সমাজের সবাই সামর্থ অনুযায়ী এগিয়ে আসতো তাহলে অসহায় মানুষদেরকে কষ্ট করতে হতো না।’
‘আমরা ৯৫’ নামে একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে হানিফের হাতে ১০ জনকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করার জন্য নগদ টাকা তুলে দেই। তাঁর এ মহৎ কাজে পরবর্তীতে আরো আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয় তখন। সানন্দে টাকা গ্রহণ করে নিজের সামর্থ অনুযায়ী অসহায়দের পাশে থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করলেন তিনি।

টাকা দেয়ার কথা বলতেই মুখ ফিরিয়ে উল্টো পথে হাঁটতে লাগলেন কালু মিয়া। জানালেন, স্টেশনে থাকেন। তবে আত্মসম্মানবোধ কমে যায়নি। এভাবে তিনি হুট করেই কারো কাছ থেকে টাকা নিবেন না। কাউন্সিলরের দেয়া সহায়তাও তাঁর মেয়ে (ছেলে বৌ) আনতে যান নি লজ্জায়।
কালু মিয়া তাঁর ছেলে বৌ হাবিবাকে মেয়ে বলেই ডাকেন। বড় ছেলে আকাশ কাঠের মিস্ত্রী ও ছোট ছেলে এবার এস. এস. সি পরীক্ষা দিবে। আখাউড়া-আগরতলা সড়কের টিএন্ডটির পাশে একটি বাসায় ভাড়া থাকেন তাঁরা। তবে এক ঘরে জায়গা হয় না বলে স্টেশনেই রাত কাটান কালু মিয়া।

হানিফ মিয়ার বাড়ি থেকে ফেরার পথে কালু মিয়া অনুরোধ করলেন যেন পারলে তাঁর ছেলেদের গিয়ে দেখে আসি। কোনো সহযোগিতার দরকার নেই। স্টেশনে থাকা একজন ভবঘুরের সন্তানরা যে কেমন হতে পারে কিংবা কত ভালো হতে পারে সেটা দেখে আসার অনুরোধ করেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার কথা হয়েছে আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার রেইনার সঙ্গে। সামনা সামনি দেখা হলে ও মোবাইল ফোনের আলাপচারিতায় উপজেলা পর্যায়ের পদস্থ এ কর্মকর্তা বললেন, ‘এই মানুষগুলোই (হানিফ, কালু) হতে পারে মানবিকতার অন্যতম উদাহরণ। তাঁদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজের বিত্তবানদেরও উচিত এগিয়ে আসা।’কথা হলে আখাউড়া পৌরসভার মেয়র মো. তাকজিল খলিফা কাজলও মানবিক মানুষ হানিফ, কালুদের প্রশংসা করেন। ওই মানবিক মানুষগুলোর জন্য কিছু একটা করা যায় কি-না সে বিষয়েও তিনি ভাবতে বললেন।

ভালো খাকুক হানিফ, কালুরা। স্যালুট আপনাদের।

সংগৃহিত: বিশ্বজিৎ পাল বাব, কলামিস্ট,

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন