প্রবাসে প্রখর রোদে তিন ঘণ্টা শ্রমের টাকায় আখাউড়ার চিকিৎসকদের জন্য উপহার

সমীর চক্রবর্তী, প্রধান সমন্বয়ক, আত্মীয়

আখাউড়া: রক্তদান আর সামাজিক কাজ ছিল রুবেলের নেশা। মানবিক মনের মানুষটি জীবন সংগ্রামে প্রবাসে। ভাগ্য বদলে সর্বশেষ মাস ছয়েক আগে পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যে। বিধিবাম, সেখানে গিয়েই পড়েন বিপত্তিতে। করোনার থাবা যে বিশ্বময়। এরই প্রভাবে মাস দুয়েক হয় কাজ নেই। ঘরেই বসা। ৮ বাই ৮ একটা কক্ষে থাকেন ১০ জন । অন্য প্রবাসীদের মতো কষ্টে দিন কাটছে তাঁরও।

প্রবাসে এই বৈরী পরিবেশের কষ্টটা অসহনীয়। এর মাঝেও রুবেলের কষ্ট দেশকে নিয়ে। দেশের মানুষ আর মানুষদের সেবায় নিয়োজিত বীরদের নিয়ে। নিজের কাজ না থাকলেও তাঁর কষ্ট দেশে এই সময়ে খাদ্য কষ্টে থাকা মানুষদের নিয়ে।

রাত তখন তিনটে, ম্যাসেঞ্জারে রিং, বিরক্তি- এটা নিশ্চয় বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন সময় আমাদের কারোরই পক্ষে না। সবুজ বাটনে চাপ দিলাম। হ্যালো বলতেই অপরপ্রান্ত থেকে রুবেলের মায়াভরা কণ্ঠ। তখনও বুঝতে পারছি না কি ঘটতে চলেছে।

সংগ্রামী মানুষটি রক্ত দিয়ে মানবিক সংগঠন আত্মীয়ে সাথে আগে থেকেই যুক্ত। বর্তমান কাজগুলোর তথ্য পাচ্ছেন ফেসবুকে। সম্প্রতি তিনি জেনেছেন আখাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা সারাদিন কাজ ছাড়াও মোবাইলফোনে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। সেই চিকিৎসকদের মনোবল ধরে রাখতে আত্মীয়ের কাজগুলোও জেনে গেছেন। চিকিৎসকদের জন্য আত্মীয় কি করছে? বিনয়ের সঙ্গে তার এই কথায় জানালাম- আত্মীয় তাদের প্রাণশক্তি বাড়াতে কয়দিন পরপরই উপহার হিসেবে ফল, দুধসহ নানা খাবার দিচ্ছে। এবার থমকে যায় রুবেলের সুর। তার হাত খালি। তারপরও সংগ্রামী রুবেলের মন কিছু করতে চাইছে।

সেই তাড়না থেকেই তপ্ত রোদ, উনুনের মতো গরম বাতাসে ঘণ্টা তিনেক কাজ করে হাতে উঠে বাংলাদেশি ৫শ টাকা। এই কারণেই এত রাতে ফোন দেওয়া। আত্মীয়ের পক্ষে তাকে বুঝানো হলো আপাতত টাকার দরকার নেই। এই টাকাটা এখন আপনিই খরচ করেন। যখন কাজ শুরু করবেন তখন দেখা যাবে। নাছোড় মানুষটির পাল্টা প্রশ্ন, এই করোনাকালে যদি না বাঁচি। তাহলে আমার হয়ে কৃতজ্ঞতা জানানোর তো কেউ নেই! তাদের উপহার দেয়ার নিয়তেই তো তপ্ত বাতাস, আর কাট ফাঁটা রোদকে উপেক্ষা করেছি। টাকাটা রুজি করেছি। এটা আপনাকে গ্রহণ করতেই হবে। আমার ইচ্ছা এই টাকায় করোনাযোদ্ধা বীর চিকিৎসকদের জন্য কয়েকটা ফল কিনে দিবেন।
রুবেল নামটি ছদ্ধ নাম। শেষ রাতের এমন ফোন কলে বিরক্তিভাব থাকলেও আলাপের পর আর ঘুমাতে পারলাম না। যে মানুষটা নিজেই এই সময়ে দারুণ কষ্টে। যিনি নিজেই অনিশ্চয়তায়। তিনি কি না, ঘাম ঝড়ানো কষ্ট করেছেন শুধু চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে। সারাক্ষণ চোখে শুধু তার পরিশ্রান্ত মুখটা ভাসছে।

ভাবছি কি অবলীলায় জয়ী হয়ে যায় এই রুবেলরা। আর দেশে আরাম আয়েশে খেয়ে আমরা কিভাবে করোনায় আক্রান্ত চিকিৎসাকর্মীদের বাসায় ঢিল ছুঁড়ি। তাদের চিকিৎসায় সন্দেহ করি। চিকিৎসক বলে বাড়ির মালিক ঘর ছাড়তে বলে। কোথাও আবার তালপাতার ঝুপড়িতে ঠাঁই হয় স্বাস্থ্যকর্মীর। করোনাযোদ্ধা বীরদের প্রতি প্রবাসী রুবেলদের এমন কৃতজ্ঞতা আমাদের সাহস দিচ্ছে। মনের জোড় বাড়াচ্ছে।

তার কাছ থেকে পাওয়া প্রেরণাই বলছে এই যুদ্ধে জয়ী হবে বাংলাদেশ- জয় হবে মানবতার। রুবেলের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে আত্মীয়ও বলছে হে বীর যোদ্ধাগণ আমরা কৃতজ্ঞ–
প্রবাসীর টাকায় কেনা ফল অাজ বৃহস্পতিবার দুপুরে চিকিৎসকদের হাতে তুলে দেয়া হয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন