রবীন্দ্রনাথ, উপমা এবং আমি # নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর

রবীন্দ্রনাথ, উপমা এবং আমি
নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর

উপমা কপালে নীল টিপ পরে প্রতি বিকেলে অপেক্ষা করে। দিনের শেষে উপমার কাছে ফিরে এলে মনে হয় জীবনের সবটুকু ভুল নয়, বেঁচে থাকা কেবল হিসেবের গরমিল নয়। আমি উপমা ছাড়া আমার জন্য আর কিছু ভাবতে পারি না।
তবু নগদ আমাকে মেলাতেই হয়। হিসেব না মিলিয়ে টেবিল ছাড়ার উপায় নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবী থেকে ছুটি নেবার সময়ও হয়ত হিসেব মিলিয়ে যেতে পারব না। পৃথিবীর হিসেব-নিকেশ চুকে গেলে পর বিদায় নেবার পালাএরকম একটি লাইন ইদানিং খুব করে মনে পড়ে। আবার এরকমও মনে হয়, পৃথিবীর হিসেব কে আর মিলিয়ে যেতে পেরেছে? আর হিসাব কি কেবল যারা আমার মত তাদের জন্য? আর কারো জন্য কি হিসাব মেলানোর বাধ্যবাধকতা নেই? সকলের জন্য নয় কেন? বাস্তবিক যেদিন দু-দশ টাকার ব্যাপার হয়, সেদিন পুষিয়ে নেয়া যায়। আর যেদিন দুশ-পাঁচশর বিষয় সেদিন মনে হয় এ জগৎ-সংসার একটা মরুভূমি। আর সেখানে উপমা একমাত্র ছায়াশীতল বৃক্ষ, সে-ই কেবল শান্তির আধার।
আর এই অবস্থায়, এক অচেনা অজপাড়াগাঁয়ে আমার বদলি হয়ে গেল। আদেশটা পাওয়ার পর সব মিলিয়ে আমার বুকটাও জলশূন্য আত্রাই নদীর মতোই শুকিয়ে গেল। এমন একটা অজপাড়া গাঁয়ে উপমা থাকতে পারবে না। আমি ওকে যাবার কথা বলতেও পারব না। আর যেখানে উপমা থাকবে না, আমার কী অবস্থা হবে। উপমাবিহীন একদিও আমি ভাবতে পারি না। এ ছাড়া জায়গাটার সম্পর্কে যা আমার জানা আছে তাতেই ভেতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে। দিনে দুপুরে হাটের উপর মানুষ জবাই করে রেখে যায়। একরাতে ছয়টা লাশ পড়ে। আমি যেমন শুনেছি, তেমনি উপমাও এসব খবর পত্রপত্রিকায় দেখে থাকবে। এটি এমন একটি উপজেলা, যেখানে না যেতে পারলে মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সরাসরি কোনো দূর পাল্লার বাস নেই। ট্রেন আত্রাই-এর উপর দিয়ে যায়, কিন্তু থামে না। আমি ভাবি, আদেশটা বদলাতে চেষ্টা করব।
আদেশটা নিয়ে আমি উপমার হাতে দিলাম। আমি ওর কী প্রতিক্রিয়া হবে সেটা তো আমি জানি। কেবল সেটা দেখার অপেক্ষায় চুপ করে বসে থাকি। উপমা আদেশটা মনোযোগ দিয়ে পড়তে থাকে।
আত্রাই!
আমি আঁৎকে উঠে উপমার মুখে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখি, ওর চোখে অন্যরকম এক আলো, আমরা আত্রাই যাচ্ছি! কবে যেতে হবে?
উপমার এমন অদ্ভুত ইচ্ছে আমাকে শুধু অবাক করল না, বিব্রতও করল। বদলির আদেশ পেয়ে আমি ভাবছি, অজপাড়াগাঁয়ে ওর থাকার অসুবিধা আর আপত্তির কথা বলে সেটা কাটাবার চেষ্টা করব। আর সে কি না উল্টো আমাকেই উৎসাহিত করছে!
তুমি কোনো অজুহাতে দেরি করবে না কিন্তু।
তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে?
আমার খুব ইচ্ছে ছিল, একদিন যাবোই যাবো।
তুমি আত্রাই যেতে চাও! কেন?
সে তুমি আমাকে নিয়ে গেলেই জানতে পারবে।
উপমার চোখের তারায় রহস্য ঝিলিক দিচ্ছে। সেটা উপভোগ না করে কী কারণে সে আত্রাই যেতে চায়, সেটাই আমি ভেবে পাই না।
উপমা, তুমি কি টিভির পর্দায় দেখো নি, সেখানে কী ঘটছে?
অন্য যে সব যুক্তি আমার মাথায় এল তা তুলে ধরলাম, অজপাড়াগাঁ। এমন একটা বাজে জায়গা তোমার কেন ভাল লাগবে আমার কিছুতেই মাথায় আসছে না।
লাগবে। আমি নিশ্চিত। তুমি অযথাই আমাকে নিয়ে চিন্তা করছ। তুমি না বল তুমি গ্রামে বড় হয়েছ, কাদামাটি মেখে বেড়ে উঠেছো, সাঁতরে স্কুলে গিয়েছো, মাছ ধরেছো জাল দিয়ে, তা হলে তুমি অত অস্থির হচ্ছো কেন, সেখানে কি আর কেউ চাকরি করছে না? সেখানকার মানুষজন কি বাড়িঘর ছেড়ে কোথাও চলে গেছে?
উপমা আমার কথা শুনে গেল, তবে ওর ভাবান্তর ঘটল না। ওর ইচ্ছা বদল হবে এমন কোনো সম্ভাবনা আমি দেখতে পাচ্ছি না। ওর বুঝি আর ত্বর সইছে না। কারণ, সে গোছগাছ করতে লেগে গেল। বই গোছাতে লাগল, আর তেমন কিছু অবশ্য গোছানোর মতো ছিল না। একটা খাট, একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার ছাড়া তো আসবাব নেই। আমি নয়, যেন উপমাই আমাকে নিয়ে নতুন কর্মস্থলে চলে আসবে। অগত্যা আমার আর কী করার থাকে?

বিয়ের পর থেকে প্রতিদিনের সন্ধ্যেটা আমরা উপভোগ করি। যখন পাখিরা কিচির মিচির করে গাছের পাতার ফাঁকে আশ্রয় খোঁজে। সাদা বক দিগন্ত ছুঁয়ে উড়ে যায়। সে আকাশের রঙ কপোলে মেখে আমার মুখের দিকে তাকায়। সে সবুজ পাতার রঙ চোখের পাপড়িতে মেখে আমার চোখে চোখ রাখে। তাতেও আমার মন ভাল না হলে রবীন্দ্রনাথের কাছে নালিশ করে।
আমি অঙ্কের ছাত্র ছিলাম, সারাদিন যোগ বিয়োগ করে কাটাতে পারি। কিন্তু বিকেল থেকে ভোর অবধি উপমার জন্য রেখে দিই। আমি আগের মতোই কাজ থেকে ফিরে এসে হাতমুখ ধুয়ে জানলার পাশে বসি। উপমার এক হাতে রবীন্দ্রনাথ আর অন্য হাতে চায়ের ট্রে। আমি উপমার কাছে নিজেকে একান্তে সমর্পন করি। সে যেন এখানে চৈত্রের বৃক্ষের মতো পুষ্পিত হয়ে উঠছে।
উপমা রবীন্দ্রভক্ত সেটা আমার জানা ছিল না। কারণ বিয়ের আগে ওর সঙ্গে দেখা হয়নি, অন্য কোনো প্রকার যোগাযোগ হয়নি। ফলে জানার কোনো সুযোগ ছিল না। বিয়ের পর বাসররাতে বাঁশী কবিতা শোনালে আমি মুগ্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সে তখনই হয়ত ওর প্রথম এবং জীবনের সেরা হাসিটি আমাকে প্রতিউপহার দিয়ে ছিল। আমি স্তম্ভিত তাকিয়ে রইলাম, মনে হল, কতকাল ধরে ও তিতাসের তীরে, তমালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার জন্য প্রতীক্ষা করে ছিল!
উপমাই হরিপদ কেরানি সম্পর্কে আমাকে ধারণা দিয়েছিল। হরিপদর জন্য ওর চোখে যে কষ্ট ফুটে উঠেছিল তা দেখে আমি অবাক না হয়ে পারি নি। যেন হরিপদ নামের কেরানিটি ওর একান্ত আপনজন। আমি মনে মনে মিলিয়ে দেখি, এদেশের কত যুবক যে হরিপদর মতো কেবল একজনকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। আমি অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি, হরিপদ কেরানি ওর পিসিদের গ্রামের মেয়েটিকে হয়তো ঘরে পায় নি, কিন্তু আমি উপমাকে পেয়েছি, আমার ঘরে উপমা এসেছে!
আমি নিজেকে হরিপদর স্থানে প্রতিস্থাপিত করি। আর জানতে চাই:
তুমি কেন আমার ঘরে এলে? আমি তো হরিপদও চাইতে বেশি কিছু নই।
তুমি আর হরিপদর মধ্যে তফাৎ আছে।
কেমন?
হরিপদ সাহস দেখায় নি। তোমার সাহস আমাকে আশ্বস্ত করেছে।
তবু রক্ষে যে, এমন কিছু বলেছ, ডাকাত না পড়লে আর প্রমাণ করতে হবে না।
ডাকাত পড়বার কি কোন কারণ আছে?
তা পড়তেও পারে। যদি জানতে পারে যে আমার ভাঙা ঘরে উপমা আছে।
আমি নিশ্চিত সে ডাকাত তোমার কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
সে যদি সাক্ষাৎ রবীন্দ্রনাথ হন?
তিনি লুট করেন না। তাঁর ভান্ডার থেকে কেবল বিলিয়ে দেন।
জানো, এখানে আত্রাই বলে কোনো জনপদ নেই, নদীর নামে নাম।
আত্রাই অনেক বড় নদী। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে সে বাংলাদেশে ঢুকেছে। রবীন্দ্রনাথ পতিসর যেতেন এই বুকে বজরা ভাসিয়ে। কবির অনেক স্মৃতি আছে এই নদীকে ঘিরে। এই নদীর নামে একটা উপজেলার নাম তো থাকাই উচিত।
আমার মনে পড়ে, ছোটবেলায় আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ফটিকের মামা। আমি আরো জানতাম, তিনি পোস্টমাস্টারও ছিলেন। কলেজ-জীবনে আমাদের পাড়ার মৌলবী সাহেব আমার এই ভুল শোধরে দিয়ে ছিলেন। তিনি বুঝিয়ে না বললে আমার জানা হতো না যে রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন। তিনি আরো বলেছিলেন, সেই জমিদারের খেয়ে কাজ ছিল না, তাই বস্তা বস্তা পদ্য লিখে রেখে গেছে। এসব পড়ে কী লাভ? আমি জমিদারের পরিচয় জানার পর রবীন্দ্রনাথের চেহারা ভুলতে শুরু করি। আমি কেন, আমাদের যুবকদের ক’জন আর রবীন্দ্রনাথকে মনে রাখে!
উপমা নতুন করে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিতে চায়। আমি সমস্ত মুখস্থ বিদ্যের ঝুলি হাতড়িয়ে দেখি আমার সঞ্চয় তেমন কিছুই নেই। তবু উপমার কাছে হেরে যাওয়ার আগে মৌলবী সাহেবের সেই সবকটা ওর সামনে তুলে ধরতে চাই।
দ্বারকানাথ ঠাকুর খুবই বৈষয়িক লোক ছিলেন। জীবনে পয়সা ছাড়া আর কিছু বুঝতেন না। রবীন্দ্রনাথ তার নাতি ছিলেন। তাহলে বুঝতেই পারছ, পয়সা তিনি কতটা চিনতেন। তুমি দেখ, জমিদারির লাভের জন্য কলকাতা ছেড়ে পতিসরের মতো এমন একটা অজগাঁয়ে এসে পড়ে থাকতেন। নিজের লেখা কাবুলিওয়ালাতে তার নিজের ছবিই তুমি পাবে।
তুমি কি মনে কর, রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশুনার জন্য বারবার পতিসর আসতেন?
তা ছাড়া আর কী?
উপমা আমার দিকে এমন তাচ্ছিল্যের চোখে তাকায়, যেন আমি এতটাই অজ্ঞ যে আমার প্রশ্নের উত্তর দেবার কোনো প্রয়োজনই নেই। অথবা ও যা বলবে তা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। যা হোক, আমিও এ নিয়ে বিতর্কে যেতে চাই না। নিজের সম্পর্কে আমার চাইতে আর কে বেশি জানে? আমি আমার অজ্ঞতা কোনোভাবেই উপমাকে জানতে দিতে পারি না। আমি ওকে এখানে সেখানে নিয়ে যাই। হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। আমি ভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে আমার সীমাবদ্ধতা আড়াল করি আর উপমার নিঃসঙ্গতাজনিত ক্লান্তি দূর করতে চেষ্টা করি।
উপমা হাত ধরে হাঁটে, আর নীরবে চারপাশ দেখে। জনপদ শব্দটিও উপমার মুখে শোনা। তবু ভাব করি যেন আমিও ইতিহাসে ছিলাম। আমি ভাবি, ও আগে গ্রাম দেখেনি বলে আমার বেশ সুবিধেই হল। তা নাহলে আমার সকাল-সন্ধ্যার টানাপোড়েনে আর নিরবতার ভারে ও আরো বেশি ক্লান্তি বোধ করত।
নীলকরদের কোনো চিহ্ন কি আর আছে?
নীলকর!
আমরা যেখানে আছি, এই জায়গাটার নাম তো সাহেবগঞ্জ, তাই না?
হ্যাঁ। তুমি জানতে!
সাহেবগঞ্জ কেন নামকরণ তা কি ভেবে দেখেছে?
না তো।
সাহেবগঞ্জ নামটা নীলকর সাহেবদের স্মৃতির সাথে জড়িত। এখানে হয়তো ব্রিটিশ শাসনামলে নীলকর সাহেবরা ছিল। সাহেব আর গঞ্জ মিলে কালক্রমে সাহেবগঞ্জ। তাদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই হয়ত আত্রাই নদীর তীরে একটা গঞ্জ গড়ে ওঠেছিল। সভ্যতা যেভাবে গড়ে ওঠে সেভাবেই আর কি! হয়ত নদীপথের গুরুত্ব কমে গেলে এই সাহেবগঞ্জ গুরুত্ব হারিয়েছে। সেই সাহেব না থাকলেও সাহেবগঞ্জ স্মৃতি হয়ে আছে।
উপমা আমাকে শিশুপাঠ্য করে বুঝিয়ে দেয়। আমি উপমাকে নিয়ে আত্রাই নদীর তীরে বেড়াতে যাই। নদীটা বরেন্দ্রভূমির বুকের অন্তস্থল থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে একটা মোড় নিয়ে হারিয়ে গেছে। আসলে হারিয়ে যায় নি। দুপাশে গ্রাম রেখে বিশাল চলনবিলের ভেতর নেমে গেছে। ওপারে সাদা কাশফুল। তার পরে মাঠ। মাঠের পরে কাজলগ্রাম। হেমন্তের নদীতে নিটোল জল। আর সেই জলে বিশাল আকাশের সুনীল প্রতিবিম্ব,সাদা মেঘের হাসি।
উপমা গুন গুন করে, কী শোভা, কী ছায়া গো..। হঠাৎ সে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, দেখো, একটা বক ধ্যান করছে।
কোথায়?
জলের ধারে। দেখতে পাচ্ছ না?
হ্যা, পেয়েছি। তবে ছোট মাছ চোখে পড়লেই ধ্যান ভাঙবে।
এই যে দেখছ, মনে হচ্ছে না, নদীটা বাঁয়ে সরে গিয়ে হারিয়ে গেছে। আসলে সেটা লুকোচুরি করার মতো একটু কৌতুক করে আবার ডানে সরে এসেছে। ওপারের গ্রামটার নাম কাশিয়াডাঙা। দেখো, নদীতীরে কেমন কাশফুল ফুটে আছে। এপারেরটা পাঁচুপুর। নামগুলো কী সুন্দর তাই না?
পাচুপুর! গ্রামটা এখানে?
তুমি নামটা জানতে?
মনে পড়ছে।
কোথায়? কে দেখাল?
আমার দাদা।
উপমা হাসে। ওর চোখে যে রহস্য ফুটে উঠেছে আমি তা ভেদ করতে পারি না। আর যখন হাসির আড়ালে রহস্যটা লুকিয়ে থাকে তখন আমি এক সবুজ বনের গভীরতার স্বাদ পাই। আমি তখন আর কোনো প্রশ্ন করি না।
আমি প্রতিদিন সকালে কাজে বেরিয়ে পড়ি। উপমা একা একা বাসায় থাকে। ও আসার সময় কিছু বই সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। এগুলো বের করে টেবিলে রেখেছে। প্রায়ই বাইরে থেকে ফিরে এসে বিছানায় বই দেখতে পাই। সবই রবীন্দ্রনাথের বই। আমি বুঝতে পারি, রবীন্দ্রনাথ এখনো ওকে ভর করে আছেন। আমি তাঁকে নিয়ে রসিকতাও করি।
কী, তোমার গুরু সারাদিনই ছিলেন বুঝি?
এখনও আছেন।
কোথায়?
কেন দেখতে পাও নি, বিছানায়?
দেখ, তুমি পরকীয়া করবে সে না হয় কর। কিন্তু শোবার ঘরে নিয়ে আসবে এটা মেনে নেয়া যায় না।
আমি তাঁকে হৃদয়ে বসিয়ে রাখবো, তাতে তোমার কী?
উপমা হাসে। ওর চোখে তীর্যক তীক্ষè আলো চিকমিক করে। সে আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যখন ও আবৃতি করে:
‘কভু তারে দিব না ভুলিতে
মোর দৃপ্ত কঠিনতা।
বিনম্র দীনতা
সম্মানের যোগ্য নহে তার
ফেলে দেব আচ্ছাদন দুর্বল লজ্জার।’
না, তুমি তা করতে পার না। তোমার গুরু তোমাকে আমার হাতে সঁপে দিয়ে বলেছিলেন, তোমরা কেবল দুজন দুজনার। তোমাদের মাঝখানে আর কেউ নয়, এমন কি বাতাসও নয়। সেটা তোমার মনে নেই? আর এখন আমি না থাকলে চুপিচুপি তোমার ঘরে চলে আসাটা তাঁর ভারি অন্যায়। এটা মেনে নেয়া যায় না।
তুমি যা বলছ সবই তিনি শুনছেন। শুনে হাসছেন।
তাঁকে বিদায় নিতে বল।
কেন?
বা রে! আমি আমার বৌকে একান্তে আদর করব আর তিনি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবেন এটা কী করে হয়?
অসভ্য।
উপমা রবীন্দ্রনাথকে পাশে রেখেই আমার সাথে যাত্রিযাপন করে। শুধু তাই নয় ও গভীর রাত পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে গল্প করে। রাত্রির আঁধার আমি বুঝতেই পারি না।
ঘুমোবে না?
দেখো কী বলেছে!
আমার ঘুম পাচ্ছে।
ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করার চাইতে বইপড়ার জন্য জেগে থাকা উত্তম।
আমি তবু রাগ করতে পারি না। সকালে আমি বের হবার কালে বুঝতে পারি, উপমা সারাদিন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেই কথা বলবে। আমার ভাবনা এতে কম হয়। যদিও এ নিয়ে আমি ওর সঙ্গে তামাশাও করি।
তুমি আমার চাইতে রবীন্দ্রনাথকেই কাছে রাখতে পছন্দ কর, তাই না?
উপমা বুঝতে পারে। চা নিয়ে এসে ঝগড়া করার জন্য পাশে বসে। ওর ঠোঁটে আনন্দের ঝর্ণা। তবু ও আমাকে ক্ষ্যাপিয়ে তুলতে চায়।
পছন্দ করি। কারণ,
“আমার যা শ্রেষ্ঠধন সে তো শুধু চমকে ঝলকে
দেখা দেয়, মিলায় পলকে।
বলে না আপন নাম, পথেরে শিহরি দিয়া সুরে
চলে যায় …..।”
কেন চলে যান?
তিনি তোমাকে ভয় পান। বলেন, তুমি না-কি তাঁর চাইতে বড় কাবুলিওয়ালা।
চান্স পেলে তোমার গুরুকে আমি খুন করতাম।
তা তোমরা করতেই পার।
তুমিও পার বটে!
ছুটির দিনেও উপমা রবীন্দ্রনাথে মগ্ন হয়ে থাকে। আর আমার চিন্তা একটাই, সেটা লগ্নি বাঁচানো। সেই জন্য আমাকে উপমা নয়, সমিতিগুলোর দিকে তীক্ষè নজর রাখতে হয়। দল গঠন করে প্রশিক্ষণ দেয়ার নামে মহিলাদের যতটা সম্ভব বোঝানো হয়। গ্রামের মানুষ এমনিতেই কারো আমানত খেয়ানত করে না। তার পর তারা যদি নারী হয় তাহলে তো কথাই নেই। নাকের নাকফুল বিক্রি করে হলেও টাকা শোধ দেবে। আমরা যতই তাদের অজ্ঞ বলি, মুর্খ বলি আসলে গ্রামে মহিলারা এমনিতেই সচেতন, যারা দিন আনে দিন খায়, তারা অভাবের মধ্যেও একমুষ্টি চাল তুলে রাখে। আসলে ওদের একটু সাহস তৈরি করে কিস্তির টাকাটা আদায়ের বিষয়ে ওয়াদা ইত্যাদি করিয়ে তার পর ঋণ দেয়া হয়। যাতে কিস্তি খেলাপী না হয়। পাঁচ জনের দল গঠন করে বুদ্ধিমান আর সাব্যস্তের লোকটাকে দলনেতা বানানো হয়। তবু কখনো কখনো কিস্তি আদায় হয় না। সেটা দিতে চায় না, সে জন্য নয়, বিপদে পড়ে দিতে পারে না। আয় না থাকলে দিবে কী ভাবে? ঋণ আদায় না হলেই বিড়ম্বনা। লগ্নি বাঁচাতে আমাকে গ্রামে গ্রামে ঘুরতে হয়। আমি ফিরে এসে উপমার সঙ্গে গ্রামের গল্প করি। সমিতির কথা বলি। শিশুদের যতœ নেওয়ার কথা, মায়েদের পুষ্টির কথা, সন্তানের লেখাপড়ার কথা মজা বলি।
জান, আমাদের গ্রামগুলো একশ বছর আগে যেখানে ছিল সেখানেই আছে। বরং বলা যায়, মানুষ বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেছে। কখন যে গ্রামের দৈন্যদশা ঘুচবে। উপমা আবৃতি করে :

“… ধীরে যেন উঠে ভেসে
কত জীবজীবনের জীর্ণ ইতিহাস।…
জীবধাত্রী জননীর কাজ বক্ষে লয়ে
লক্ষ কোটি জীবকত দুঃখ, কত ক্লেশ,
কত যুদ্ধ, কত মৃত্যু নাহি তার শেষ।”

নিশ্চয় তোমার গুরুর কবিতা?
শুধু তাই নয়, কবিতাটা এখানেই লেখা।
চলো, গ্রামে ঘুরে আসি।
পাঁচুপুরে?
পাঁচুপুরে কেন? তুমি কি পাঁচুপুর সম্পর্কেও জান?
আগে জানতাম না। এখন জানি।
কী জান?
পাঁচুপুর খুব পুরাতন জনপদ। ব্রিটিশ আমলে এখানে থানা ছিল। তখন নওগাঁতেও থানা হয় নি।
তুমি এত কিছু জান!
আমি উপমাকে নিয়ে পাঁচুপুর বেড়াতে যাচ্ছি। যেন আমি নই, ওর সঙ্গে আমি যাচ্ছি। উপমা মটর সাইকেল নিতে দিল না। ও ভ্যানে চড়ে দু’পা দুলিয়ে দুলিয়ে যাচ্ছে। আমি পাশে বসে ওকে দেখছি। ওর চোখ কী যেন কেবলই খুঁজে বেড়াচ্ছে। বিকেলের সোনা রোদ ওর কপোলে স্বর্ণাভা মেখে দিয়েছে। কালোচুলের সুষমা আমার হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে সেটা ও টের পাচ্ছে না। ও দেখছে, দুপাশে অফুরন্ত বিল ডান পাশে এখন সবুজ ছাওয়া। আর বাঁয়ে নদীর তীর ঘেঁষে দীঘল গ্রাম। মাটির ঘর, দেয়ালের ওপর টালির চালা।
আমি মন্তব্য করি, এখানকার একটা বৈশিষ্ট্য হলো মাটির ঘর, টালির ছাউনি।
এই টালির সঙ্গে আমাদের সভ্যতার যোগসূত্র আছে।
কীরকম?
তুমি আমাকে একদিন সোমপুর বিহারে নিয়ে যাবে?
সেটা কোথায়?
পাহাড়পুর।
পাহাড়পুর? যাওয়া যাবে একদিন।
এখান থেকে খুব বেশি দূর নয় তো। এই তো বদলগাছিতে। ট্রেনেও যাওয়া যাবে।
কিন্তু, কথা হচ্ছিল টালি নিয়ে। টালির ফাঁকে পাহাড়পুর কেন?
তুমি সেখানে গেলে দেখবে, বাংলার মৃৎসভ্যতার কী অপূর্ব নিদর্শন রয়েছে! হাজার হাজার বছর আগেও এদেশের শিল্পীরা কত সৃষ্টিশীল ছিলেন তুমি ভাবতেই পারবে না। টেরাকোটাগুলো জীবন্ত হয়ে বিহারের দেয়ালে ফুটে আছে। এই পোড়ামাটির শিল্প তো হাজার হাজার বছরের বাঙালির জীবনের সঙ্গে, ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু এখানে নয়, সারা বাংলাদেশেই তাকিয়ে দেখ না, পটুয়া ছিল, এখনো হারিয়ে যায় নি, যদিও কোনো রকমে টিকে আছে। কিন্তু তোমাদের বহুজাতিক আগ্রাসনে একদিন সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।
কীভাবে?
যেভাবে বরেন্দ্র জাদুঘরের সম্পদ চলে যাচ্ছে। মিডিয়ার বদৌলতে কিছু জানা গেছে, আর অজ্ঞাতসারে কত কী চলে গেছে! আগে কত কী গেছে তার কী হিসেব আছে? পৃথিবীর কোন যাদুঘরে আমাদের চুরি যাওয়া কী আছে তার সন্ধান কি কেউ করেছে? আর সন্ধান করলেও কি হিসেব মিলবে? থাক, সেসব কথা। পাহাড়পুর গেলে তুমি আমাদের প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের প্রমাণক দেখতে পাবে।
আচ্ছা, যাবো। আমরা পাঁচুপুর এসে গেছি।
আমরা ভ্যান থেকে নেমে পড়ি। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটা যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানে গভীর ক্ষতের মতো দহের কাজল জলে চিরায়ত নারীরা অবেলায় গা ধুইতে নেমেছে। একটা মাছরাঙা কী একটা মাছ রাঙা ঠোঁটে ধরে নিয়ে শিমুলডালে গিয়ে বসল। শিমুলডালের মাথায় লাল লাল ফুল আমি এতক্ষণ খেয়ালই করিনি। আমি চোখ তুলে তাকাতেই সহসা একটা লাল ফুল উপমার মাথায় পড়লে আমি সেটা কুড়িয়ে নিয়ে আবার ওর খোঁপায় গুজে দিই। ও নীরবে হাসে, হাসিটাও তখন পুষ্পরঞ্জিত হয়ে ওঠে।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাই। আজ খেয়াল করি, সেইসব দিনের টালিছাওয়া দালানকোঠার চিহ্ন এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা বটগাছ নদীর বুকে হেলে পড়ে ডুবে মরার চেষ্টা করেও না পেরে কিছু ডালপালায় ভর করে জীবন নিয়ে কোনো রকম টিকে আছে। একটা বহুপুরাতন খিলান নদীভাঙা মাটির ভেতরে থেকে বেরিয়ে রয়েছে দেখে উপমা দাঁড়িয়ে পড়ল। এটা ওটা খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখে মন্তব্য করল,
ব্রিটিশ আমলেই পাঁচুপুরে বেশ ধনী মানুষ ছিল। আর থাকতেই হবে। না হলে রবীন্দ্রনাথ পাঁচুপুরের মহাজনদের কাছে ধার করবেন কেন?
তাই নাকি! জমিদারও ধার করতেন?
আচ্ছা, তোমরা যে মানুষকে ধার দাও তাতে লোকের উপকার হয়?
হবে না কেন? উপকার না হলে ঋণ নিচ্ছে কেন?
কী উপকার হচ্ছে?
আমি উপমার কথায় অন্যরকম ইঙ্গিত পাই। সে কী বোঝাতে চায়? উপকার কতটা হচ্ছে সে ব্যাপারে আমিও নিশ্চিত না। আমার কাজ ঋণ মঞ্জুর করা আর আদায়কৃত অর্থের হিসেব রাখা। আদায় করার জন্য মাঠকর্মী আছে। তারাই গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঋণের কিস্তি আদায় করে। ইদানিং ঋণের কিস্তি আদায় কমে গেছে। মহিলারা দিতে চায় না। কর্তৃপক্ষকে বোঝানোর জন্য মাঝে মাঝে বাধ্যতামূলক সঞ্চয় থেকে কেটে নিয়ে কিস্তি আদায় দেখানো হয়। কোনো কোনো মাঠকর্মীর বেতনও কর্তণ করা হয়। শুধু আমি নই, সকলেই, সব এনজিওর ম্যানেজারই বাধ্য হয়ে এমনটি করে। মাঝে মাঝে ভাবি, কী করছি আমি? এনজিওগুলো কী করছে? উপমা মাঝে মাঝে ওর গুরুর একটা কবিতার লাইন আউড়ায়, সেটা যেন আমাকেই কটাক্ষ করে, “দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।” কিন্তু আমি কী করতে পারি? আমাকেও তো বাঁচতে হবে! আমার মতো লক্ষ লক্ষ এনজিও কর্মী জীবন বাঁচানোর জন্য এনজিওর কাছে দায়বদ্ধ। তারা তো কিছুতেই স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার মূলধন জোগাতে পারেনি। তাদের কেউ কেউ যৌবনে আমার মতো দিন বদলের স্বপ্ন দেখেছে। যেমন করে জীবনের সব দায়ভার নিয়ে প্রান্তিক চাষী কোনো মহাজনের দ্বারে এসে দাঁড়ায়, তেমনি স্বপ্ন হারিয়ে হতাশ শতসহস্র যুবক বেঁচে থাকার জন্য এনজিওর দ্বারে এসে হাজির হয়েছে।
তুমি কি জান, রবীন্দ্রনাথ পাঁচুপুরের মহাজনদের কবল থেকে চাষীদের রক্ষা করবার জন্য কী করেছিলেন?
তিনি জমিদার ছিলেন, হয়তো জমিদারি বাঁচাতে তাঁদের ধমক দিয়েছিলেন।
আসলে পাঁচুপুরের চড়াসুদের দাদনদারদের কবল থেকে রায়তদের রক্ষা করবার জন্য কৃষক সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ কৃষকদের দারিদ্র্য দূর করে দিয়ে গেলে তো আমাদের আর কাজ করতে হতো না।
তিনি সে চেষ্টা করেছিলেন। তোমাদের যারা পূর্বসূরী সেই পাঁচুপুরের মহাজনদের হাত থেকে দরিদ্র কৃষকদের বাঁচাতে নোবেল পুরস্কারের টাকায় সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আমার মনে হয়, সেটি তিনি লোক দেখানোর জন্য আর খ্যাতির জন্য করেছিলেন।
তুমি জানবে কী করে নোবেল পাওয়ার পর তাঁর আর বেশি খ্যাতির প্রয়োজন ছিল না। আর দরকার পড়লে তিনি তা কলকাতায়ও করতে পারতেন। এমন অজপাড়া গাঁয়ে আসতেন না। আরও কী কী করতে চেয়েছেন শুনবে?
বলো।
আমেরিকা থেকে কৃষিবিজ্ঞানে পড়িয়ে এনে এখানে কলের লাঙলে কীভাবে চাষ করতে হয় কৃষকদের শিখিয়েছেন। আর সব উন্নয়ন কর্মকা-ের কথা না হয় না বললাম।
কবি মানুষ, তিনি খেয়ালখুশি মতো চলবেন, যা ইচ্ছে হয় করবেন, জমিদার হলে তো সেটা করা আরোসহজ। পরের ধনে পোদ্দারী যাকে বলে।
ভোগ বিলাস তো দূরের কথা, সংসার চালানোর জন্যও পর্যাপ্ত আয় জমিদারি থেকে হতো না।
সেটা হয়ত তাঁর অদক্ষতা ছিল।
তোমরা অবশ্য খুব দক্ষতা দেখাচ্ছো। তোমাদের দক্ষতায় এদেশ থেকে দারিদ্র্য নয়, দরিদ্র পালিয়ে বাঁচার পথ খুঁজে না পেয়ে আত্মহত্মা পর্যন্ত করছে।
তুমি বলতে চাও, মানুষকে ভালবেসেই রবীন্দ্রনাথ পতিসরে আসতেন, জমিদারি রক্ষার জন্য নয়?
মানুষের প্রতি রবীন্দ্রনাথের ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ তোমার অজ্ঞতাই প্রকাশ করে।
তিনি জমিদার ছিলেন, এটা কি মিথ্যা?
মিথ্যে নয়। কিন্তু তিনি কেমন জমিদার ছিলেন সেটা জানলে তোমাদের ভুল ভাঙতো। সমবায় আর কৃষিব্যাংক স্থাপনের কথা না হয় বাদই দাও, তোমাদের যারা কর্ণধার তাঁদের মধ্যে এমন কেউ কি আছেন, যিনি রবীন্দ্রনাথের মতো তাঁর সন্তানকে আমেরিকায় কৃষি বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত করে পতিসরের মতো পাড়াগাঁয়ে এনে কৃষকদের আধুনিক কৃষি শিক্ষার ব্যবস্থা করবেন?
আমি আর তর্ক করতে সাহস পাই না। এতক্ষণ ওকে খুঁচিয়ে মাটির কাছের রবীন্দ্রনাথকে জানতে গিয়ে ওকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। কিন্তু এজন্য ওকে এখনই সরি বলতে চাই না।
আমরা নীরবে পাশাপশি হাঁটতে থাকি। গ্রামের যেখানে শেষ সেখানে আরেকটি গ্রাম। এখানে সরকার থেকে একটি বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। পুলিশ ব্যারাকের মতো লম্বা ঘর, ভাগ করে করে কতগুলো পরিবারকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে, এর নাম আশ্রয়ণ। ভূমিহীন মানুষের জন্য সরকারি উদ্যোগ। এখানকার বাসিন্দাদের এনজিওরাও ঋণ দিতে চায় না। কিন্তু আমাদের এনজিও ঋণ দিয়েছে, দিয়েই যেন ফাঁটাবাঁশে আটকে গেছে। কিছুতেই ঋণ আর আদায় হচ্ছে না। কর্মসংস্থান করতে না পারলে সেই টাকা কী করে মহিলারা ফেরত দিবে? এদেশে যে পরিমাণ ঋণ গ্রামগুলোয় দেয়া হয়েছে তা একসঙ্গে করলে টাকার পাহাড় হয়ে যাবে। তবু ঋণ কেবল বেড়েই চলেছে। এনজিওর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। তাহলে কি উপমার কথাই সঠিক?
সন্ধ্যে নামছে। লাল সূর্যটাকে এক অজানা রাহু রক্তিম মেঘের আড়ালে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে মিলিয়ে টানছে। সমস্ত চরারচর শেষ বিকেলের আলো আর উত্তাপ মেখে নিচ্ছে। কয়েকটি পাখি লাল মেঘের কোল ঘেঁষে আকাশ পাড়ি দিচ্ছে। উপমা আবৃতি করে।
“ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ করো না পাখা।”
আমি মুগ্ধ হয়ে পাখি দেখি। দেখতে দেখতে উপমার কথা ভাবি। হিসেব মেলাতে চেষ্টা করি। কিন্তু মেলাবার আগেই পেছন থেকে একজন মহিলা দৌড়ে কাছে আসে। আমি কিছু বুঝবার আগেই হাত চেপে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে।
হামকেরে বাচান। হামাক স্বামীরে বাচান।
কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?
আপনার লোক আমাক ঘরের টিন লামায় লয়া গিছে।
কোথায়? চল দেখি।
একটা খাটিয়ায় মহিলার স্বামী শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। সোঁ সোঁ শব্দ হচ্ছে। যেন সত্যি সত্যি কামারের হাঁপড় উঠছে আর নামছে। আমি উপমাকে বলেছি ঋণ দিয়ে আমরা মানুষকে স্বাবলম্বী করে তুলছি। ওর কথা না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু আর কেউ যদি এই বিষয়টি জেনে পত্রিকায় প্রকাশ করে দেয় তখন কী হবে। যা হোক, সহসা একটা বুদ্ধিও মাথায় খেলে যায়। যত দ্রুত সম্ভব কোনো একটা সমাধান বের করতে হবেই।
চালের টিনগুলো উদ্ধার হয়ে গেলে আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। আর কাছেই একজন পল্লিডাক্তারও পেয়ে গেলাম! তা না হলে লোকটাকে হয়ত বাঁচানো যেত না। অবশ্য লোকটা মরলেও ততটা ক্ষতি হতো না, যদি না এরকম একটা কা-া ঘটত।
তবু বুঝতে পারলাম, আমার উদ্যোগে উপমা খুশি হয়েছে। ওর খুশি ওর একান্ত বিষয়, কিন্তু আমার ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের মান রক্ষা করতে পেরে আমি যে কতটা খুশি সে কথা উপমা কখনো জানতেও পারবে না।
রাত নামছে। আমরা একটা ভ্যান ডেকে উঠে পড়ি। উপমা নীরব। সে মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। সেখানেও যেন চাঁদের আলো এক করুণ মায়াবী জাল বিছিয়ে রেখেছে।

2 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন