করোনা পরিস্থিতি এবং জলবায়ু পরিস্থিতি

34

পৃথিবী আজ এক চরম দুঃসময় পার করছে। একদিকে করোনা মহামারী পৃথিবীকে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। অন্যদিকে মেরু অঞ্চলের বরফ পৃথিবীর ইতিহাসের যেকোনো সময় হতে দ্রুত গলে যাচ্ছে। যার দরুন আমেরিকা কানাডার মতো ঠাণ্ডা আবহাওয়ার দেশ আজ দেখছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার দিন সমূহ। কানাডার তাপমাত্রা ৫১ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যাহা অনেকের কাছে অকল্পনীয়। দেশটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার মানুষ মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে মারা গিয়েছে। দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার পাহাড়ে। তাহা কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে বলতে পারবে? কলম্বিয়ার ফায়ার সার্ভিস একাধিক দাবানলের কথা জানিয়েছে। সেখানকার দমকল বাহিনীর মুখপাত্র এরিক বার্গ জানিয়েছেন দাবানল নতুন নতুন জায়গায় দেখা দিচ্ছে। ১৩০ টির মত ছোট-বড় দাবানলের কারণে লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত দু’বছর আগে অস্ট্রেলিয়াতে টানা দু’মাস দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় ৫০ কোটি পশুপাখি গবাদি পশু দাবানলে পুড়ে মরে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া কলোরাডো সহ বিভিন্ন রাজ্যে দাবানল প্রায়ই ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলোর পিছনে বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন দায়ী। সুমেরু অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড এন্টার্কটিকার বরফ যে হারে কমছে এভাবে যদি চলতে থাকে তবে চলতি শতকেই সমুদ্রের গড় উচ্চতা ৩ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। যার জন্য পৃথিবীর প্রায় ৪১ কোটি মানুষ পানির নিচে তলিয়ে যাবে। এজন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহ বিশেষ করে মালদ্বীপ, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার অধিকাংশ জায়গা সমুহ পানির নিচে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ভারতের মুম্বাই এবং কলকাতার মত বড় শহর গুলো পানির নিচে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পৃথিবী আজ উষ্ণ হয়ে যাচ্ছে। অনেক বনজ ও জলজ উদ্ভিদ কঠিন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন কে সমুদ্রের জলরাশি আস্তে আস্তে গ্রাস করছে। এন্টার্কটিকা মহাদেশের উষ্ণতা ও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বাড়ছে। এরইমধ্যে ওই অঞ্চলে সর্বোচ্চ উষ্ণতম গ্রীষ্মকাল অতিবাহিত হয়েছে। বরফাচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাসকারী পেঙ্গুইন, মেরু ভল্লুক এর অস্তিত্ব আজ সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে।

আফ্রিকার নীল নদের পানি ক্রমশ কমে যাচ্ছে। নীলনদ আফ্রিকার দশটি দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভূমধ্য সাগরে গিয়ে মিশেছে।এ নদের পানি প্রবাহের অন্যতম উৎস হচ্ছে ইথিওপিয়ার হাইল্যান্ডস। ইথিওপিয়া নীল নদের উৎসে বাধ নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাইছে। যাহার প্রভাব সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশে পড়বে। যদিও মিশর, সুদান, ইথিওপিয়া এরইমধ্যে আলোচনার টেবিলে বসেছে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য।

ই‌তিহাস বল‌ছে উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফের পাহাড়গুলো শত বছর ধরেই গলে বড় বড় হিমবাহের সৃষ্টি করছে। সময়ের প‌রিবর্তনের সাথে হিমবাহের এই বরফ গলে যাওয়া উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিগত ক‌য়েক দশক ধরে উত্তর মেরুর এই বরফ গলে সমুদ্রে মিশেছে সব চেয়ে বেশি গ‌তি‌তে। এ সময়ে প্রতি বছর ১৫০ গিগাটন তথা ১৫০ বিলিয়ন মেট্রিক টন বরফ গলে পরিণত হয়েছে সমুদ্রের পানিতে। সাধারণত সমুদ্রে দু’ধরনের বরফ দেখা যায়। একটি হল ভাসমান জমাটবাঁধা বরফ যাহা সমুদ্রের উচ্চতা কে বাড়ায় না। অন্যটি হলো গলিত বরফ যাহা তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের জলে মিশে এবং সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি করে। প্রতি বছরে গলিত বরফের হিসাবটি হলো ১ গিগাটন = ১,০০০,০০০,০০০ মেট্রিক টন, আর ১ মেট্রিক টন = ১০০০ কেজি।
যদি গ্রিনল্যান্ড দ্বীপের সব আইসশিট ও সুমেরু অঞ্চলের বরফের সবগুলো পাহাড়ে বরফ গলা ঠেকানো না যায় এবং সত্যি সত্যিই সে বরফ পুরোপুরি গলে এর পানি সমুদ্রে গিয়ে মিশে, তবে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা ৭.৯ মিটার বেড়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।

পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান হার ঠেকাতে না পারলে অত্যন্ত ভয়াবহ বিপজ্জনক ঘটনা ঘটে গেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। তখন অনেক দেশই সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাবে। অস্তিত্ব হারাবে অনেক দেশ। আমাদের বাংলাদেশও একইভাবে সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কাও প্রবল। মেরু অঞ্চলের এই অস্বাভাবিক হারে বরফ গলে যাওয়ার প্রবণতা রোধের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে গোটা মানবজাতির জন্য। এ ব্যাপারে আর্কটিক কাউন্সিল বিশ্বের প্রতিটি দেশের সরকারকে সাথে নিয়ে সম্মিলিত সতর্ক পদক্ষেপ না নিলে মানবজাতিকে নিশ্চিত এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

২৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হিমালয় পর্বতের বরফ সমূহ এখন দ্বিগুণ হারে গলে যাচ্ছে। এই পর্বত হতে গঙ্গা,সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, মেকং, ইরাবতী সহ অসংখ্য বড় বড় নদীর উৎপত্তি হয়েছে। যাহা মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাকে প্রাকৃতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। ঐ অঞ্চলসমূহ পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলের চাইতে সবুজ এবং সমৃদ্ধ। যদি এমন ভাবে বরফ গলতে থাকে তবে চলতি শত‌কেই হিমালয়ের অর্ধেক বরফ গলে যেতে পারে। বরফাচ্ছন্ন শৃঙ্গ গুলোর উচ্চতা ক্রমশ কমে আসতে পারে। বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ চীন ও ভারত সহ ওই অঞ্চলের অঞ্চলের অন্যান্য দেশসমূহে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসবে। এজন্য বাংলাদেশসহ ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশসমূহকে বিশ্বজলবায়ু সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। হিমালয় এর জন্যই দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া আজো প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর। যদি হিমালয়ের বরফ গুলো সম্পূর্ণ গলে যায় তবে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার ৩০০ কোটি মানুষের কি হবে? যেহেতু এটি পৃথিবীর সবথেকে জনবহুল জায়গা, এজন্য এ অঞ্চলের মানুষকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধানত চীন ও ভারতকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এ দুটি বিশাল দেশ শুধুমাত্র পরমাণু শক্তিধরই নয়, তারা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। এমনকি জনসংখ্যার ক্ষেত্রে পৃথিবীর কোন দেশই তাদের ধারে কাছেও নেই। তারা যদি কার্বন নিঃসরণ কে কমিয়ে দিয়ে এক হয়, তবে হিমালয় সহ পৃথিবীর অধিকাংশ স্থানেই জীব বৈচিত্র‌্য আবারো চলে আসবে।

সত্যিকার অর্থে চীন ও ভারতের দ্বন্দ্ব শুধুমাত্র পানি নিয়ে। যদিও দুটি দেশের ব্যক্তিগত পানির সঙ্কট অত্যন্ত কম। কারণ চীন,ভারত, বাংলাদেশ , মায়ানমার এ পৃথিবীর সর্বাধিক নদী অবস্থিত। শুধুমাত্র পারস্পরিক ক্ষমতার দাপট দেখাতেই চীন ও ভারত লাদাখ সীমান্ত কে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছে। পৃথিবীর ফুসফুস খ‌্যাত আমাজন বন এবং আফ্রিকার কঙ্গো রেইনফরেস্ট কে রক্ষা করতে না পারলে পৃথিবীতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাবে।

বাংলাদেশ নামক মহান দেশটিও প্রাকৃতিক ভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রকৃতি আমাদের দুহাত ভরে পদ্মা, মেঘনা ,যমুনা ,ব্রহ্মপুত্র, আত্রাই, কর্ণফুলী, কীর্তনখোলা সহ অসংখ্য নদ-নদী দান করেছে। কিন্তু আমরা নিজেরাই নদীগুলো দূষণ করে ফেলেছি। এখনই যদি নদীগুলোকে তাদের পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে না পারা যায়, তবে আমাদের উপরে প্রকৃতির ধ্বংসলীলা আরো দ্রুততর হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে ঘন ঘন ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। সিডর, আইলা ,নার্গিস, মহাসেনের মত ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব কে বাংলাদেশকে প্রায়ই মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এটা মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যই হচ্ছে। দেশের আমাজন খ্যাত সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে। সমুদ্রের নোনা পানির স্রোত ধারার প্রবাহের জন্য প্রতিবছর শত শত হরিণ এবং কিছুসংখ্যক রয়েল বেঙ্গল টাইগার মারা পড়ে। প্রয়োজনে এ সমস্ত পশুদের চারণ ক্ষেত্র কে নিরাপদ করতে হবে। যার জন্য রক্ষা পাবে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম এবং জীববৈচিত্র্যতা।

সিলেটের টিলা পাহাড় সহ দেশের প্রতিটি পাহাড় কে সুরক্ষিত করতে পারলেই দেশের নিরাপত্তা বলয় গড়ে উঠবে। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। নদী খননের নামের হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সীমাহীন দুর্নীতিকে দমন করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান সময়ে সরকারের পরিবেশ রক্ষার কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে বুড়িগঙ্গা নদীতে নতুন প্রাণের জোয়ার লেগেছে। নদীতীরের ট্যানারিশিল্প গুলো সরানোর ফলে নদী দূষণের মাত্রা কমে আসায় বুড়িগঙ্গায় এখন স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানি দেখা যাচ্ছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নদীতে এখন জাল ফেলে মাছও ধরা হচ্ছে। অবশ্য অনেকেই বলেছেন বৃষ্টির মৌসুমে আষাঢ়,শ্রাবণ ,ভাদ্র এই তিন মাস সময় বুড়িগঙ্গার পানি দুর্গন্ধ মুক্ত থাকে। কিন্তু আমাদের নিজেদের বাঁচার জন্য বুড়িগঙ্গার পানি কে চিরস্থায়ী ভাবে দুর্গন্ধমুক্ত এবং দূষণমুক্ত করতে হবে। যাহা হবে সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু ঢাকা শহরে ২ কোটি মানুষের বসবাস যাহা সমগ্র অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার মানুষের সমান। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের অক্সিজেন কে বুড়িগঙ্গা নদীই গতিশীল করতে পারবে তার সুবিস্তৃত দূষণমুক্ত জলরাশি দিয়ে। সরকারের এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান অবশ্যই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।ধনী দেশ সমূহ ভেদাভেদ ভুলে যদি বিশ্ব জলবায়ু চুক্তিতে সবাই ইতিবাচক স্বাক্ষর করে তাদের পৃথিবী রক্ষার ওয়াদাকে কাজে রূপদান করে, তবে বিশ্ব আবার তার আগের জায়গায় ফিরে আসবে।

বর্তমানে সারা পৃথিবীব্যাপী করোনার তাণ্ডব চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। যার মধ্যে ৪০ লক্ষ মানুষ করোনায় প্রাণ দিয়েছে। বিশ্বের সমৃদ্ধ দেশ যুক্তরাষ্ট্র ,যুক্তরাজ্য, ইতালি,জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, তুরস্ক ,ইরান,ই‌ন্দো‌নে‌শিয়া, ভারত, ব্রাজিল অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থা পার করে আজ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এর মূলে অবশ্যই ভ্যাকসিনের ভূমিকা প্রধান। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ পার করছে করোনার ভয়ংকরতম পরিস্থিতিকে। আজ পৃথিবীতে ভ্যাকসিন রাজনীতি শুরু হয়েছে। ধনী দেশ সমূহ প্রয়োজনের অধিক ভ্যাকসিন মজুদ করে রেখেছে। যেখানে গরিব দেশ সমূহ ভ্যাকসিনের অপ্রতুলতার জন্য মহামারীর দিকে এগুচ্ছে। এর জন্য বিশ্বের প্রধান টিকা উৎপাদনকারী দেশ সমূহ কে সারা পৃথিবীতে যথাযথ ভ্যাকসিন সরবরাহ করে পৃথিবীর মানুষকে করোনা মুক্ত করতে হবে। সবচেয়ে আশার কথা হলো মহামারি করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এখন অনেকটাই কমে গেছে। ভবিষ্যতে এ সঙ্কট থাকবে না। এটা অবশ্যই বলা যায়। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৃথিবীটাকে নিরাপদ করতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস মুক্ত করতে হবে। সজল মল্লিক।১১.০৭.২০২১.

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন