ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বালু বোঝাই ট্রলারের সাথে যাত্রী বোঝাই নৌকার সংঘর্ষ নারী শিশুসহ নিহত ২২

4

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধিঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তিতাস নদীর পূর্বে লইসকার বিলে বালু বোঝাই ট্রলারের সাথে যাত্রী বোঝাই নৌকার সংঘর্ষে ২২জন নিহত হয়েছে। শুক্রবার (২৭ আগস্ট) বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে জেলার বিজয়নগর উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের লইসকার বিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রলার ডুবির ঘটনায় আহতদের জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ করেছেন। নৌকায় থাকা বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক আসাদুজ্জামান জানান, বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর মডেল স্কুল এন্ড কলেজ সংলগ্ন নৌকা ঘাট থেকে দিনের শেষ নৌকাটি যাত্রী বোঝাই করে বিকাল সাড়ে চারটায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের আনন্দ বাজার ঘাটের উদ্দেশ্যে ছাড়ে। বিকাল পোনে ছয়টায় মিনিটের সময় নৌকাটি শেখ হাসিনা সড়কের আনন্দ বাজার তিতাস নদীতে ঢোকার পূর্বে চম্পকনগরগামী দুটি বালু বোঝাই ট্রলারের সাথে ধাক্কা খেলে যাত্রী বোঝাই নৌকাটি উল্টে যায়। নৌকায় থাকা শতাধিক যাত্রীই পানিতে ডুবে যায়। নৌকার ছাউনিতে থাকা যাত্রীরা সাঁতরিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পারলেও নৌকার ভিতরে থাকা অধিকাংশ নারী ও শিশু নিহত হয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায় ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী নৌকাটিতে ১২০জন যাত্রীসহ বিজয়নগর থানার চম্পকনগর থেকে সদর থানার আনন্দবাজার ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা করে। পথিমধ্যে লইসকা নামক স্থানে বিপরীত দিক থেকে বালু বোঝাই ইঞ্জিনচালিত নৌকার সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে ইঞ্জিন চালিত যাত্রীবাহি নৌকার অনুমান ১২০ জন যাত্রীসহ নৌকা ডুবে যায়। অধিকাংশ যাত্রী তাৎক্ষণিক সাঁতরিয়ে নদীর কূলে উঠে। ডুবে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে এ পর্যন্ত ২২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের নাম যথাক্রমে সদর উপজেলার চিলিকোট গ্রামের আব্দুল্লাহ মিয়ার মেয়ে তাকওয়া (৮), দক্ষিণ পৈরতলার আবু সাঈদের স্ত্রী মোমেনা বেগম (৫৫), উত্তর পৈরতলার ফারুক মিয়ার স্ত্রী কাজলী বেগম, উত্তর পৈরতলার হারিজ মিয়ার মেয়ে নাফসা আক্তার(৩), সাদেকপুরের ফুয়াদ মিয়ার ছেলে তানভীর (৮), গাছতলা নরসিংসার জামাল মিয়ার ছেলে সাজিম(৭), বাটপাড়ার জারু মিয়ার মেয়ে (১৮) শারমিন, দাতিয়ারার হাজী মোবারক মিয়ার মেয়ে তাসফিয়া (১২), বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগ গ্রামের জহিরুল হক ভূইয়ার ছেলে আরিফ ভূইয়া ও মামুন ভূইয়া (২০), গেরারগাঁও গ্রামের মৃত কালু মিয়ার স্ত্রী মঞ্জু বেগম(৬০), জজ মিয়ার স্ত্রী ফরিদা বেগম(৪০), জজ মিয়ার মেয়ে মুন্নি (৬), আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী মিনারা বেগম, মৃত আব্দুল হাসেমের স্ত্রী কমলা বেগম @ রৌশনারা, নুরপুরের মন মিয়া, আদমপুরের অখিল বিশ্বাসের স্ত্রী অঞ্জলী বিশ্বাস(৩০), ঝরনা বেগম(৫৫) খোকন মিয়া, সাং—অজ্ঞাত, থানা—অজ্ঞাত, আদমপুরের তিথিবা বিশ্বাস (২), পরিমল বিশ্বাস, মনিপুরের মৃত হাজী আবদুল বারী চেয়ারম্যানের ছেলে সিরাজুল ইসলাম (৫৮) বাদেহারিয়ার কামাল হোসেনের মেয়ে মাইদা আক্তার(৬) ময়মনসিংহ জেলার গোপালপুরের শাওন মিয়ার ছেলে সাজিদ (৩) মোছা. রুবিনা আক্তার, মো. সোলায়মান মিয়া, পুকুরপাড়ের সোলায়মান, সানাবর্ষিপাড়ার আব্দুল বারী ভূইয়ার স্ত্রী মোছা. নুসরাত জাহান মৃত্যুবরণ করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল থেকে ২০টি মরদেহ এবং ঘটনাস্থল থেকে ০২টি মরদেহ মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের লোকজনের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিনা ময়না তদন্তে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। তথাপিও ফায়ার সার্ভিস, ডুবুরি দল ও পুলিশ কর্তৃক উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত আছে। দুর্ঘটনায় কবলিত নৌকাটি এখনো পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। নৌকা দুর্ঘটনায় ডুবে যাওয়া নৌকাটি এখনো উদ্ধার করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় পত্তন ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামের বাসীন্দা জিল্লু মিয়া জানান, কোন এক নৌকার মাঝি আমরার বন্দর বাজারে খবর দিলে আমরা গ্রামের মানুষরা তাদেরকে উদ্ধার করতে আসলেও শুক্রবার রাত পর্যন্ত কোন প্রশাসন থেকে কোন উদ্ধারকারীর দল পানিতে নামেনি। আমরাই মরদেহগুলি উদ্ধার করি। নদী নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন নোঙর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, আনন্দ বাজার-চম্পকনগর নৌ-পথে চলাচল করা যাত্রীবাহী নৌকাগুলোর ২০-৩০ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকলেও তারা যাত্রী বহন করে ১০০-১৫০জন। অথচ এসব নৌকা ঘাটে কোন দপ্তরের কোন ধরনের তদারকি নেই! এ ঘাটগুলো কারা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তাও কোন দপ্তর জানেনা অথবা জানা থাকলেও অদৃশ্য কারণে হস্তক্ষেপ করছেনা বলে আমরা মনে করছি। দুর্ঘটনার পরপর বিআইডব্লিউটিএ’র আশুগঞ্জ-ভৈরব বন্দর কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে ডুবুরি পাঠিয়ে সাহায্য করতে অনুরোধ করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় জেলা প্রশাসক মহোদয়, পুলিশ সুপার মহোদয়, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উপস্থিত থাকলেও নিজেদের সক্ষমতা না থাকার কারণে নৌকা বা মরদেহ উদ্ধারে কোন ধরনের কাজ করতে পারেনি। যে কয়টা লাশ উদ্ধার হয়েছে স্থানীয় মানুষদের সহযোগিতায় সম্ভব হয়েছে। নোঙর দীর্ঘদিন যাবত নৌ-পথে যাত্রীদের নিরাপত্তার কথাটি বলে আসলেও কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা গুরুত্ব না দেয়ার কারণেই নৌ-দুর্ঘটনায় যাত্রীদের প্রাণহানি ঘটছে। নৌ-পথে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এড়াতে অবিলম্বে বৈধ অবৈধ নিবন্ধনহীন বালু ট্রলারের নির্বিঘ্নে চলাচল, নৌযানে লাইফ জ্যাকেট, বয়া, নৌযানের নিবন্ধন, প্রশিক্ষিত চালক ও কোন ধরনের নৌযানে কতোজন যাত্রী বহন করতে পারবে তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে আশুগঞ্জ ভৈরব নৌ-বন্দর কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে ৪ সদস্যের ডুবুরির দল সকাল ৮টায় উপস্থিত হয়ে নিখোঁজ হওয়া নাফসা আক্তারকে সকাল পোনে দশটায় ডুবুরিরা তার মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা ম্যাসিস্ট্রেট মো. রুহুল আমিন অবশিষ্ট শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে অবশিষ্ট নিখোঁজের স্বজনেরা দাবি না করায় মরদেহ সমাপ্তি ঘোষণা করেন এবং নৌকাটি উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন এবং ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়া হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খাঁন বলেন, এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে সদর সার্কেল মোজাম্মেল হক রেজা ফায়ার সার্ভিসের ব্রাহ্মণবাড়িয়া উপ-সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম ভূইয়াকে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারা নিহত হয়েছে তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে এবং আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন